Thursday, November 1, 2012


‘সম্রাটের চেয়ে কিছু কম সম্রাটত্ব’...

তন্ময় বীর

 

সুনীল বলেছিলেন জীবনানন্দ তাঁর প্রিয় কবি, কমলকুমার প্রিয় কথাকার, অথচ ‘এদের দুজনের কোনো লেখার সঙ্গেই আমার কোনো মিল নেই’ কিন্তু চমকে উঠতে হয় যখন জীবনানন্দে পাই- ‘সে শরীর ঈশ্বরের চেয়ে কিছু কম গরীয়ান’ এর মতো শব্দবন্ধ বা ‘তুমি তো জানো না কিছু – না জানিলে,/ আমার সকল গান তবুও তোমায় লক্ষ্য করে’র সমান্তরালে সুনীলউচ্চারণ - ‘এ কবিতা মধ্যরাত্রে তোমার নিভৃত মুখ লক্ষ্য করে’‘নির্জন স্বাক্ষর’-এর অন্তরালে লীন হয়ে আছে নীরার জন্মবীজ। আজীবন শব্দ অক্ষর কমা ড্যাশ রেফ ও র-এর ফুটকি সমেত শরগতি জিবনানন্দীয় ম্লানমৌনতা থেকে কীভাবে জন্মঋণ পেয়েছে তা সবিশেষ অনুসন্ধেয়। বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথকে আপাত অস্বীকারের ছলে উত্তরাধিকারের ভিতে নবনির্মাণে যে সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে সেখানে তিনি তাঁর নিজের বিশেষণেই সম্রাটের মতো। নিজস্বতার শর্তেই তিনি দখলদারি পেয়েছিলেন; যাপনের অকৃত্রিমত্বে জোর অর্জন করেছিলেন ভাষা-সংস্কৃতির অভিভাবকত্বের। এই যে সেদিন লিখলেন - 'অধিকাংশ বাঙালি মূর্খ, তাদের শিল্প-সাহিত্যের কোনও বোধই নেই। অর্ধেকের বেশি বাঙালি তো এখনও পড়তে-লিখতেই জানে না।’ একথা অন্য কেউ বললে, এরকম চপেটাঘাতের মতো বললে কী প্রতিক্রিয়া হতো ভাবা যায়! মাথা নিচু করে মেনে নিতে হল কেননা সুনীল বলেছেন। সেই বস্তুবাদী সুনীল, যিনি নির্দ্বিধায় সপাটে বলে দেন বহুনন্দিত ইংরাজি রচনার সারবত্তাহীনতার কথা, না-পড়া বই ‘পড়েছি’ বলা মিথ্যাভাষণের সগর্বিত স্বীকারোক্তি করা সুনীল। যাঁর জীবনের অন্যতম প্রিয় উক্তি-

O, throw away the worser part of it,
And live the purer with the other half

এখন আমাদের সুনীল-সাম্রাজ্যের সেই purer part-কেই আবিষ্কার করার দায়।

Thursday, June 14, 2012


তার মুখে বনলতার ভাস্কর্য

তন্ময় বীর



শু

রুটা শেষ দিয়ে করে যাক্‌। ১০ এপ্রিল, গুয়াহাটি ছেড়ে দীপর বিল ডানহাতে রেখে সরাইঘাট এক্সপ্রেস এগোচ্ছে; কলকাতায় থামবে সেই ভোরে। ঘনায়মান মেঘ দুপুরের প্রখরতাকে সহনীয় করেছে। দূর পাহাড়ের মাথায় মনখারাপ রঙের মেঘ বিষাদ বিছিয়ে রেখেছে। বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস মিলছে। চলমান জানলায় চোখ রাখতে রাখতে কবিতা এলো মনে-

বৃষ্টি আসুক তোড়ে
ট্রেন থেমে যাক
সময় উল্টো হাঁটুক
অঘটন একটা ঘটুক
ঘোষণা হোক অকস্মাৎ
গাড়ী যেন গৌহাটিতে ফেরে

সাধারণত এরকম হয় না, এরকম ভাবালুতা ঠিক আমার ধাতসই নয়। দেখলাম খুব নীচে দিয়ে একটা প্লেন উড়ে গেল, ওই বুঝি বিশিষ্ট সব কলকাতার মানুষরা উড়ে গেলেন; জয় গোস্বামী, নবারুণ ভট্টাচার্য, সন্দীপ দত্ত, বিশ্বনাথ রায়, অরুণ বসু প্রমুখ। ওঁরাও কী আকাশপথে এভাবে নস্টালজিক প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবছে। রণেন-’দা (মূকাভিনয় শিল্পী) পাশে থাকলে কথায় কথায় এড়িয়ে যাওয়া যেতো এই পরিস্থিতি, স্মৃতি পেড়ে ফেলতে পারতো না এরকম অক্টোপাসের মতন। তো তিনি বসে আছেন সেই স্লিপার বগির একেবারে শেষ সীমায়, আর আমার টিকিট আপগ্রেট হয়ে হয়েছে টু-এসিতে, একেবারে ট্রেনের মাথার দিকে। অগত্যা কী আর করা, আত্মনিয়ন্ত্রণ করে টেনে বার করলাম মার্কেজের বই, নিঃসঙ্গতার একশ বছর। আসার পথে কিছুটা পড়ে রেখেছিলাম ভেবেছি যাওয়ার পথেই শেষ করবো। ঢুকে গেলাম সেই মাকোন্দো গ্রামের আশ্চর্য সময়ে, যখন সবাই অনিদ্রা রোগের কারণে ভুলে যাচ্ছে সব, অতীত বর্তমান। বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচতে সব জিনিসের গায়ে কাগজ সেঁটে লিখে রাখছে তার বর্ণনা। এমন সময় বিস্মৃতির ওপার থেকে ফিরে আসে মেলকিয়াদেস, সঙ্গে নিয়ে আসে ক্যামেরা। তারই কল্যাণে সকলে ফিরে পায় স্মৃতির চাবিকাঠি। এই ম্যাজিকে যখন ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি তখনই মোবাইল জানান দিল বারতা (মেসেজ) এসেছে। সে লিখেছে- ‘সেফ জার্নি, টেক কেয়ার...’। তখনই বরষা এলো চরাচর ডুবিয়ে। জীবন্ত হয়ে উঠল মালিগাঁও-এর সন্ধ্যা, পথ হারানোর স্মৃতি...

মালিগাঁও কালীবাড়ি গেস্ট হাউস থেকে সিনিয়র রেলওয়ে ইন্সটিটিউসন খুব একটা দূর নয়। একবার চিনে নিলেই হলো। সব্জিবাজারের কাছে রেললাইনের নীচে দিয়ে একেবারে নাক বরাবর। বাম হাতে পাহাড় সঙ্গী থাকবে নাক উঁচিয়ে সর্বক্ষণ। রাস্তায় মানুষজনের দেখা মেলে কদাচিৎ। দু-পাশে মনোহারী পসরা সাজানো দোকান নেই, নেই দৃষ্টিরোধক বিজ্ঞাপনী আলোকোজ্জ্বলতা, গাড়ির মিছিল নেই। এই-পথটুকু যাঁরা  ব্যবস্থাপকদের দেওয়া গাড়িতে যাওয়া-আসা করেছেন তাঁরা অনেক কিছুই মিস্‌ করেছেন। রাতের আঁধার  বিদ্যুতের আলোয় সামান্য ম্লানআর লোডশেডিং হলেই আদিম অন্ধকার ঝুপ করে নেমে আসে পাহাড় চুড়ো থেকে সেই আঁধারেই পথ হারালাম ∑ তখনই বর্ষা এসেছিল...

এ-গলি সে-গলি ঘুরে অবশেষে জেনারেটরের আলোয় উজ্জ্বল সিনিয়র রেলওয়ে ইনস্টিটিউসন চিহ্নিত করা গেল...

দু-দিন ধরে (৭-৮ এপ্রিল, ২০১২) এখানে চলছে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলন। প্রাণটা টের পাওয়া গেল কিছুক্ষণ পরে, গোয়ালপাড়ার গানের সুরে যখন ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য অবলীলায় ঢুকে পড়লেন নাচের বৃত্তে। যে সন্দীপ দত্ত এখন দু-পা হাঁটতে গেলে একবার হোঁচট খান তিনিও কোমরখানাকে বিশবার দুলিয়ে  এলেন, চোখ তাঁর চক্‌চক্‌ করছে প্রবীণ শরীরে এহেন তারুণ্য উৎসারের অভিনবত্বে এ-যেন বিহুর মহড়া চলছে! বাইরে বেরিয়ে দেখি অধ্যাপক কান্তার ও অন্যান্যরা নবারুণ ভট্টাচার্যকে ঘিরে আলোচনায় মগ্ন। নবারুণ-’দার চোখেও বিস্ময়ের আলো। এইতো শিকড়ল্গনতা, এইতো স্বতঃস্ফূর্ত সংস্কৃতির দোলায় স্পন্দিত জীবন। মনে পড়ে গেল বীরেন্দ্র ভট্টাচার্যের উপন্যাসের একটি উক্তি। নাগাল্যান্ড থেকে কলকাতায় পড়তে যাওয়া এক যুবককে তার কলকাতার বন্ধু বলেছিল ... সভ্যতা আমার অবাধ উন্মুক্ত প্রেম বিনষ্ট করে দিল। আমারও মনে হল আমরা ক-জন সেই বিনষ্ট কোষ্ঠির জগত থেকে এসেছি সরল এই কামাক্ষীয় প্রেমের জগতে। তাহলে মিথ কী সত্যি হয়ে উঠছে এরকম ব্যাখ্যায়, অবিমিশ্র সরলতার কাছে সমতলের জটিলতা এসে বিমুগ্ধ বিস্ময়ে আত্মসমর্পণ করছে উপায়হীন। বিবিমিষাময় জগত থেকে এসে ফ্যাতাড়ু আর ফ্যাতা সাঁই সাঁই উড়াল দিতে পারলো না। স্বীকার করে নিলেন, এই-যে স্ফূর্তির সাবলীল উৎসার তা এই পাহাড়তলীর নাড়ীতেই রয়েছে। আনন্দঝর্ণাধারায় নর-নারীর এই সহজ-ছন্দস্পন্দনে,  কাছাকাছি আসার পরম্পরায় যতই আধুনিকতার প্রলেপ লাগুক-না-কেনো তা এখনো সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়নি।

বিষয়টা কী এতটাই সরল! তবে কোন্‌ প্রেরণায় এই উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে হাংরি আন্দোলনের সমর্থন তৈরি হয়, ‘রেনেসাঁ’র সম্পাদকেরা প্রভাবিত হন নানান তথাকথিত অতিআধুনিক রূপ-রীতি-দর্শনের সঙ্গে, ‘ভায়া গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’-এর সুতীব্র চিৎকার শোনা যায়, বিকাশ সরকারের কবিতায় মৃত্যুর ম্লানকথা ফিরে ফিরে আসে? এই যে মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র আরক্ষণ, যে বিদীর্ণ আত্মবিরোধের ইতিহাস ও বর্তমান সেওতো উপেক্ষণীয় নয়। সবই কী মিশে নেই যাপনের অন্তর্নিহিত ধারায়? ভারতরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা , বহুজাতিক ও ভাষিক রাষ্ট্রের যেসব সুবিধা অসুবিধা, কেন্দ্রের সঙ্গে প্রান্তের ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক দূরত্ব, সর্বোপরি  বিশ্বায়নের প্লাবন মিলিতভাবে কিরকম বিশিষ্টতা দিচ্ছে এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সত্তাকে; সেই সঙ্কট ও সম্ভাবনার বহুকৌণিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না থাকলে তা বুঝে ওঠা যায় না সহজে।  কেবল আত্মতৃপ্তি বা আত্মখননের মৌলবাদী পথে একে সবটা অনুধাবন বা সমাধান করা যাবে না।

মূলত অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলিতে রাজনৈতিক প্রাধান্য (কখনোবা তার উল্টো) এবং সেখানেই ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক বিকাশ তরান্বিত হয়েছে।  স্বাভাবিকভাবে নিকট অতীত বা চলমান বর্তমানের এমন স্থানসীমা ও তার পরিপার্শ্বকে জুড়ে নিয়ে যে  ভাষাসংস্কৃতির প্রবাহ তাকেই মূলধারা বলে মান্য করা হয়। এই মান্যতা নিয়ে বিতর্ক উঠতে পারে, উঠেছেও। রোসাঙ রাজসভার কাব্যকে আমরা রাঢ়-নদীয়ার বাংলা ভাষা-সাহিত্যের সঙ্গে একাকার করে ফেলছি। আমরা কিন্তু ভুলে যাই ব্রহ্মদেশের রাজা ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদাবাদ ও তার পূবদিকের অঞ্চলগুলিকে ফিরিয়ে দেবার জন্য ইংরেজদের কাছে আবেদন করেছিল। কেননা  তিনি ওই অঞ্চলের লোকেদের তাঁর রাজ্যের স্বাভাবিক প্রজা বলে দাবি করেছিলেন। যদি তা ঘটতো তাহলে কী বদলে যেত না ‘ভুবন’ চিহ্নিত আজকের সমীকরণ?

কী হতে পারত প্রশ্নটা সেটা নয়, তবে এই যে বাংলা ভাষার বিস্তার, সে যদি  এভাবে ক্রমশ ইংরেজিলগ্ন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার অনুগত দাসে পরিণত না হতো  তাহলে এই  বিহার, ওড়িশা,পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও আজকে যাকে সামগ্রিক ভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বলছি সেই বিস্তারিত ক্ষেত্রের (এবং অবশ্যই অন্যদের কথা ভুলে যাচ্ছি না)  বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষাসম্পদের সমন্বয়ে আর পৃথিবীমান্য মেধার আলোয় উজ্জ্বল এই ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি; যে-ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ কিনা সংখ্যার বিচারে আজ ষষ্ঠ; সংখ্যার মতো মানের, বিস্তারের, প্রভাবের, অবদানের সবক্ষেত্রেই প্রথমসারিতে আসন নিতো সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক বিখণ্ডতা, ধর্মীয় বিরোধ, গোষ্ঠী বা জাতির আত্মস্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গোঁড়ামি, আত্মঘাত সব দিক দিয়ে দুর্বল করে দিল আমাদের ভাষাভিত্তিকে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ভাষা সমেত ঘাড়ে চাপিয়ে স্বভাষায় জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন ইতিহাসচর্চায় অবহেলা কফিনে শেষ পেরেক পুঁতেছে। হাতের পেনসিল বলতে ছিল কেবল সাহিত্য গান তাও কী দশা তার তা আপনারা নিজে বিচার করলেই ভালো, আমি বলে দিলে পরিভাষা নিয়ে বিতর্ক হবে  অহেতুক।

এহেন সামাজিক পরিস্থিতিতে শুধুই চোখ বুজে আত্মগাথা সঙ্কীর্তন হবে! তা বাঞ্ছনীয় নয়।  মরে গিয়েও প্রেতাত্মা ব’লে সে বেঁচে আছে। সে হাস্যকর পরিস্থিতি আজও যে কেউ কেউ করছেন না তা নয়, তবে এই সম্মেলনের সংগঠকরা সে বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

একেবারে শেষলগ্নে সেই ভালোলাগার তৃপ্তিতে হাতে ধরা দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু সিগারেটের  দিকে তাকিয়ে তার চেয়েও দ্রুত চলে যাওয়া দু-দিনের কথা ভাবতে গিয়ে বিশেষভাবে মনে হচ্ছিল  এই দু-দিন পারস্পরিক পৃষ্ঠকুণ্ডয়ন  কূটকাচালি কৌশলী বিষোদ্‌গার নয় প্রকৃতই অতীত ও বর্তমানের অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন এঁরা এক উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। একই সঙ্গে একাডেমিক ও নন- একাডেমিক উভয় ধারাতেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল মিলনপ্রাঙ্গণভাষা-সংস্কৃতির প্রতি তীব্র দায়বদ্ধতা ছাড়া এরকম উদ্যোগ কখনোই সম্ভব নয়। শুভ্র সচেতনা থেকেই তাঁরা আত্মজনের নিবিড়তায় সম্মিলিত করতে পেরেছে অসমীয়া রাজবংশী প্রভৃতি ভাষার কাগজকে এবং আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন অসমের বিশিষ্ট মানুষদের। এই আদানপ্রদান যত বেশি সাবলীল হয় সামগ্রিকভাবে ততই মঙ্গল। ‘ভূমি’ পত্রিকার সম্পাদিকা রশ্মিরেখা সে-কথা যথার্থভাবে উপাস্থাপন করেছেন। তিনি বাংলা ও অসমীয়া লিটিল ম্যাগাজিনের একটি মিলিত প্লাটফর্ম তৈরীর প্রেরণা পেয়েছেন এই আয়োজন থেকে, সে-কথা থেকেই বোঝা যায় এই প্রচেষ্টা কীভাবে ধীরে ধীরে অগ্রচিন্তার বাহক হয়ে উঠবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি ভারতের আন্যান্য প্রান্তে বাংলাচর্চার কেন্দ্রগুলি কীরকম গোষ্ঠীদ্বন্দ্বজীর্ণ। এই দলাদলি নামান্তরে যে আত্মক্ষয় তা কাকে কে বোঝাবে! সেই প্রক্রিয়াটি যে এরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন তা বোধহয় নয়, তবে আনেকাংশে যে পেরেছেন তার একমাত্র কারণ বলে মনে হয় তরুণ রক্তের আধিপত্য। আর এই তরুণদের অধিপতি চিরযুবা ঊষারঞ্জন ভাট্টাচার্য। তবে খুব আশা করেছিলাম বিজিতকুমার ভট্টাচার্যকে পাবো, কিডনির সমস্যা নিয়েও যিনি শেষদিনতক্‌ কলকাতা বইমেলার ধুলো খান।

আমি গিয়েছিলাম নিমন্ত্রিত হয়ে, কিন্তু বলার চেয়ে শোনাটাই শ্রেয়তর মনে হচ্ছিল। দেখলাম জয় গোস্বামীকে এঁরা  স্বরচিত গীতবাণী দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন, তাঁকে কেন্দ্র করে  কবিতাপাঠ করছেন আবার অত্যন্ত সচেতন প্রশ্নবাণে উস্‌কে দিচ্ছেন গভীরতর সমাজবাস্তবের রূঢ়তাকে। ঊষারঞ্জন যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্র সরকারের রবীন্দ্রসার্ধশততম জন্মোৎসব পালনের বিজ্ঞপ্তিতে বানানের বহর দেখিয়ে লজ্জা দিচ্ছেন আমাদের, যখন দেখছি তিনসুকিয়া আগরতলা শিলচর শিলং শোণিতপুর লামডিং,শিলিগুড়ি আরও আরও নানা প্রান্ত থেকে সকলে এসে মতবিনিময় করছেন অধ্যাপক কবি সম্পাদকরা, উৎসাহের সঙ্গে কবিতা পড়ছেন তখন আমার মতো রবাহূত অজ্ঞানীর মূক হয়ে সন্তর্পণে কানপেতে থাকা অতীব জরুরি। বক্তব্য উপস্থাপনের চেয়ে তাই রসদসংগ্রহের জন্য আগ্রহান্বিত হচ্ছিলাম বেশি।

দু’টো বিষয় মাথায় নিয়ে গিয়েছিলাম, অবশেষে যা বলেছি তা হয়তো তুচ্ছ, যে-কথা বলা হল না তাই দীর্ঘতর। সে-গুলো ভাগ করে নিয়েছি মঞ্চের নীচে সকলের সঙ্গে লিটিল ম্যগাজিনের টেবিলে বসে, সকালে সন্ধ্যায় খবার ঘরের আড্ডায়

... চমক ভাঙল ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক ডাকে। বর্ষা থেমে গেছে। ট্রেন তখন কোনো একটা নদী পেরোচ্ছে, অপূর্ব সাদা মেঘেরা দিনশেষে যেন মায়ের কোলে ফিরে পা ছড়িয়ে বসেছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে।

আবার একটা মেসেজ এলো ট্রেন কতদূর পৌঁছল... সব ঠিক আছে তো?


যা! এত কিছুর মাঝে আসল কথাই বলাই হোল না, কার মেসেজের কথা বলছি এরকম বার বারফেরার পথে কে এভাবে জড়িয়ে থাকছে আপদমস্তক। আজ থাক্‌ সেকথা; বরং স্বচক্ষেই দেখে নেবেন কার সঙ্গে ছাতাহীন চেরাপুঞ্জিতে হাঁটছি, কিম্বা কার হাত ধরে শ্বাপদের আশঙ্কা উড়িয়ে রাতের আঁধারে হেঁটে নামছি কামাক্ষা পাহাড় থেকে, কার সঙ্গে শেষ ফেরীতে ফিরছি উমানন্দ থেকে, বিহুর আসরে বা ময়নামতি পাহাড়ের মাথায় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের দেয়ালে কার মুখে খুঁজছি বনলতার ভাস্কর্য...

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ tanmaybir@gmail,com / www.tanmaybir.blogspot.in


Monday, April 23, 2012


বসন্ত ও বিশল্যকরণী

তন্ময় বীর


ডাক দেওয়ার আগেই শীতরুক্ষ

দধীচি আঙুলে জেগে ওঠে

অব্যর্থ কচি নিমপাতা


নিমগ্ন শব্দজীব

ছন্দলেখে প্লুত, এখনও হৃদয়

হাতড়ে ফেরে পেলবতা


বসন্ত নির্ঘোষ কত

মাঝপথে থেমে আছে অনাথ

কূলহীন নিথর অহল্যা


সচকিত করে চপল মধুমাস

অসমাপ্ত চুম্বনে চলে গেছে

নিষ্ঠুর নির্মম অবহেলায়


নির্বোধ গর্ধভের পায়ে

রাধাচূড়া ঝরেছে

ময়দানের ঘাসে অবিরাম


কৃষ্ণচূড়া হাতে নিয়ে কবে

মনে হয়েছিল তিমির তিমির

হননের গান; ট্র্যাডিশন সমান


চলে; এই যে অঞ্জলি

শষ্পে পড়ে অবারিত

নির্বাক হরিণ বস্ত্রের মতো


লুঠ হতে হতে লুঠ হতে হতে

ক্লান্ত বিস্রস্ত বিবশা

শুয়ে আছে যেন নিশ্চিত।


বসন্তের ছোঁয়াচে অকাল শিং

রাত্রির গাঢ় মদে

জন্মদেশে অপ্রতিরোধ্য শিহরণ


তোলে জেনে পূর্বাহ্নে

তৃতীয় নেত্রে বসন্তসেনার

উদ্যত সদণ্ড শাসন।


চূতমঞ্জরী মায় মালতী মল্লিকা

টবের সম্পদ তারা কতটা চেনে

রঙিন বসনপ্রান্ত।



উদাসী বাঁশিতে নেই

নাগরিক উদগ্র  উচ্ছ্বাস, এখানে

প্রত্যহ ফোটে চিরবসন্ত ।



কী কী হারিয়ে গেল

তার তালিকা করি

যারা আর কুহুস্বর শুনবে না



তাদেরও এপিটাফ লিখি।

কোকিল কি তেমন আছে

বসন্তবিলাপ, পুষ্করিণী ভীমা?


ভুয়ো পলাশি আগুনে

সত্যি ফাগুন পুড়ে যাচ্ছে

কেউ কাঁদছে না!


সময়ের জাদুঘরে

ক্যলেন্ডারের নির্ভুল খাঁচায়

সোনালি কফিনে বন্ধি



সকরুণ বাসন্তিক লাশ

একহাতে বিশল্যকরণী যার

অন্য হাতে বিনাশী অভিসন্ধি



আত্মসচেতন বিমূঢ় জন্মযুবকের

জন্য দু-মিনিট নীরবতা ..


নিরাময় হাতে নিয়ে

খেতে ভুলে যায়

যে অস্বীকার করে সব সতর্কতা।

Sunday, April 22, 2012


Facebook

তন্ময় বীর


হাত বাড়ালে বন্ধুতা

বন্ধু বাড়ালে আরও হাত

নির্জন তালুতে সুবাসিত

অক্ষর ঝরে সহস্রধারায়

বৃষ্টিতে যেভাবে ভেজে মাঠ

অযুত শিহরণবৃত্ত

বুক জুড়ে হৃদয়ের গোঠে



বন্ধুতা রাখা সুকঠিন নয়

বান্ধব হারানো বেশ সাবলীল

সহজিয়া বন্ধুচর্যায়

ফিরেছে শবর তার

শবরীর সাথে দিবালোকে

মত্ততার কাপাস তুলোয়


ওরকম উড়ে চলা ভারহীন

ছুঁয়ে ছুঁয়ে দোতারা বাজানো

ক্ষণসুখী অক্ষরসজ্জার লীলা

পৌরাণিক আলোয় রঙিন


বিশ্বজিৎ জালের থাবায়

সকলেই লিখছে নাম

সব ছেড়ে মুখের মাহাত্ম্যে


হয়তো আগামী তার

স্থানাঙ্ক ভুলেছে হৃদ্‌-এর

চতুঃপার্শ্বে ঘনঘটা

দাঁত নখ চোখ চুল কান

মুখের অরণ্যানী হৃদয়বিহীন





তন্ময় বীর, tanmaybir@gmail.com, phone- 9831380685

Friday, March 9, 2012


সুলীন বিদ্রোহ

(নীল বিদ্রোহের ১৫০ বর্ষ স্মরণে)

তন্ময় বীর



খুব সুখী, স্বপ্নে অবিরল

শাসকহীন শান্ত প্রজাকুল

একপাত্রে মেহনতের অন্ন মেখে খায়

কেউ কারো পদানত নয়

অলুন্ঠিত সুরক্ষিত ধনমান

গর্ভবতী ধর্ষণ করে না

কোনো অবিমৃষ্য রোগ

মরা ছেলে কোলে বসে নেই

উদ্মাদিনী মা

আদালত সসমান বেঁটে দিচ্ছে

বিচারের অমৃত পাতে পাতে

নির্লজ্জ সব ময়রানি

বেবুশ্যে সটান তাকাচ্ছে

বড়ো ছোটো মেজোবাবুদের চোখে

নির্বংশ তোরাপ

গোপী দেওয়ান শকুন পোষে

প্রতিরোধের আভাস নেই

স্মৃতি-সত্তার সুনীল গভীরে

উন্নত শাসকের তূণ ও তীর

সুকৌশলে মুছে দেয় বিভাজন

  ইতিহাসরেখা

আজ কোনো বিপ্লব নেই

পথ খোলা নেই

নির্বিকল্প ঊর্ণনাভজালে

মরে যাওয়া ছাড়া