Sunday, February 9, 2014

একটি ভারতীয় গল্প (বঙ্গানুবাদ) সংকলনের^ মুখবন্ধ
তন্ময় বীর

ভাষা রাষ্ট্রের একমাত্র পরিচয় নয় বা রাষ্ট্র ভাষারও একমাত্র পরিচয় নয়। ভাষা রাষ্ট্রকে তোয়াক্কা করে না; রাষ্ট্র ততখানি ভাষা-উদাসীন হতে পারে না বরং সে ভাষার সহায়তা-উন্মুখ; সে ভাষাকে শস্ত্ররূপ দেয়। ‘ভারত’-পরিচয়ে ভাষা তেমনভাবে সংহতিসহায়ক নয়; উপরন্তু তাকে অকেন্দ্রায়িত করে দিতে চায়। তবে ভাষাশক্তিতো একক ও সর্বৈব নয়। ধর্ম, কৌম, জীবিকা, বাসভূমি, সামাজিক নিগঢ় প্রভৃতি এরাও শক্তিধর। এগুলির অসমচারিত্রিক বিস্তার একইরকমভাবে ভারতীয়ত্ব-বান্ধব নয়। এতদ্‌সত্ত্বেও, অসমকত্বের ময়লা চাদরের নীচে অন্তঃপ্রবাহী ভারতীয়ত্ববোধের জাদু যেভাবে অজর জীবন্ত থাকে পুরাণ, মহাকাব্য, রাজনীতি ও সমাজনীতিতে তা বিস্ময়ের।  ত্রিখণ্ডিত স্বাধীনতা বিন্যাসের পরও তা মলিন হয় না! ভারতীয়তার ধারণা কী স্বাধীনোত্তর সার্বভৌম ভারত-এর একক সম্পত্তি, নাকি তার আঁচল ছড়িয়ে আছে সীমান্ত ছাড়িয়ে পূর্ব-পাশ্চিমে আবহমান; ধর্ম-রক্ত-অশ্রু উত্থান-পতন ভুল-ঠিক মৌলবাদ-উদারতায় মিলেমিশে মহাকাব্যিক মহানতায়? নাকি ‘ভারতীয়ত্ব’-এর দুটি পর্ব: স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও স্বাধীনোত্তর ভারতীয়ত্ব?
ভারতীয়ত্ব একটি বোধ। ভাষা, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, কৌম, ভূগোল এরা প্রত্যেকেই তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কেউ-ই পুরোটা নয়। ভারতীয়ত্ব হ’ল আত্মা; দৃশ্যগ্রাহ্য প্রতিমা নয়, একটি তত্ত্ব। বহমান সময় ধারায় না-হ্যাঁ-এর দ্বন্দ্বে সুমাহান আশ্চর্য নির্মাণ। হিমালয়ের উচ্চতা এবং বর্ধমানতা উভয়ই এর উপমান। এটি একটি নির্মীয়মাণ তত্ত্ববিশ্ব যার শেষকথা এখনও বলা হয়নি।
গত পঞ্চাশ বছরে দু’শ পঞ্চাশটি ভাষা হারিয়ে বর্তমানে ভারতবর্ষ সাত’শ আশিটি ভাষায় কথা বলে ছিয়াশি রকমের লিপিতে লেখে। এর মধ্যে দশ হাজারের বেশি মানুষ কথা বলে এমন ভাষা এক’শ বাইশটি।* সব ভাষা ‘সাহিত্য’ রচনার স্তরে উন্নীত হয়েছে কিনা সে বিচারের ঔদ্ধত্য না দেখানোই ভালো। সাহিত্যের মাপকাঠি আর্যতিলকলাঞ্ছিত সভ্যতাগর্বীর লাখেরাজ নয়, তার মাত্রাগত বহুত্বকে মানতে হবে।  এমনকি  লিপিরূপহীন ভাষার অলৌকিকতা সম্বন্ধে উন্নাসিক অবজ্ঞা  যৌধিষ্ঠিরি  অন্ধতারই সামিল। সংবিধানস্বীকৃতির পঙ্‌ক্তিভোজনে বসা ভাষাগুলির মধ্যে ভারতবর্ষের নির্জ্ঞান সমাধি নয়। তার বহুরৈখিক বিস্তার তাৎপর্যময়।   
ভারতের ভাষাসমূহকে ‘ভারতীয় ভাষা’ বলার অসুবিধা আছে। কয়েকটি ভাষা যেমন অন্য রাষ্ট্রেরও ভাষা, তেমনি কয়েকটি ‘অভারতীয় ভাষা’ ভারতভূমিতে সুবিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সতর্কতার সঙ্গে যথার্থ বলতে হলে দ্বৈত পরিচয় দান আবশ্যিক, যেমন ‘ভারতীয় বাংলা’, বা ‘ভারতীয় উর্দু’ ইত্যাদি।  এরকমটা বলা যেতে পারে ‘স্বাধীনোত্তর ভারতীয় বাংলা’, ‘স্বাধীনোত্তর ভারতীয় উর্দু’ ইত্যাদি। বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, ডোগরি, কুড়ুক, নেপালি, মৈথিলী, ভোজপুরি, খাসি, গারো, সাঁওতালি, মৈতেই, কক্‌বরক, তামিল, জংখা  প্রভৃতি ভাষা একই সঙ্গে ভারত এবং কখনো-বা বাংলাদেশ, কখনো-বা পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান বা শ্রীলঙ্কা-র জাতীয়তার পরিচয়বাহীও বটে।   
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুন্নত প্রযুক্তি বিস্তার ভাষা-দেশ-সমাজভাবনার নতুন রসদ দেয়। পৃথিবী জুড়ে তৈরি হয়ে উঠেছে ‘ভাষা-দেশ’, যা আর রাষ্ট্রপরিচয় নিয়ন্ত্রিত নয়। যে-কোনও রাষ্ট্রে, ভাষা-সমাজে বা ভূগোল পরিসরে অবস্থান করে নিজস্ব ভাষা-পরিচয়ে নিজেকে চিহ্নিত ও সংযুক্ত করা যেতে পারে সমভাষিক দলের সঙ্গে। ভৌগোলিক ব্যবধান বা পারস্পরিক অসংযোগ ও অনৈকট্যের প্রতিবন্ধকতা আর সংখ্যালঘুত্বকে ঘনিয়ে তুলতে পারছে না। এমনকি নির্জন দ্বীপবাসীও আপন অক্ষর-ভাষায় অনর্গল সংযোগের সাবলীলতায় হয়ে যেতে পারছেন তার নিজস্ব ভাষাপৃথিবীর নাগরিক। বহু বহু মানুষ দূরান্তরে বসে আপন ভাষা-নির্ঝরের ধারায় স্নাত হচ্ছেন এবং প্রয়োজনে নিজেও অংশগ্রহণ করছেন নানান আদান-প্রদানে-নির্মাণে। আধুনিক প্রযুক্তি তাকে এ সুযোগ করে দিয়েছে। ‘বাস্তব-সদৃশ’ (ভার্চুয়াল) জগত ‘প্রকৃত বাস্তব’-এর আর এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে তুলছে। সুতরাং ভারতের ভাষার কোনও রচনা শুধুই বন্ধনী চিহ্ন নির্দিষ্ট ‘ভারতীয়ত্ব’কে ধারণ করবে এমনটা নাও হতে পারে। বর্ণঅক্ষরশব্দবাক্যে সে মূলানুগ থেকেও চারিত্র্যে অন্য দেশ বা সামাজ-মনকে ধারণ  করতে পারে, সর্বোপরি সেই অনন্যতা নিয়েই সে অসীমান্তিক এক ভাষা-দেশের নাগরিকতার হকদার। যেমন করে ‘ভারতীয় সাহিত্য’ লেখা হচ্ছে ইংরেজি ভাষায় তেমনি করে নিকট ভবিষ্যতে ইংল্যান্ডীয়, আস্ট্রলিয়ান বা আরব্য সাহিত্য লেখা হবে বাংলা, হিন্দি বা তামিল ভাষায় এমনটা ভাবা এই উপনিবেশোত্তর পৃথিবীতে আর দুঃসাহস নয়।            
একটি রাষ্ট্রের পক্ষে একটি ভাষাকে পরিপুষ্ট ও শক্তিশালী করার ভাবনাটাই সুবিধাজনক। একটি ভাষার মধ্যে বহু দেশের ও সমাজের অনুপ্রবেশই আনন্দজনক। রাষ্ট্রের জন্য রাজনীতি, ভাষার জন্য মন-নীতি; কাঁটা তারের চোখ রাঙানি নেই তার কোনোখানে।
পাঠক এই সংকলনে বিধৃত বাংলা ভাষায় অনূদিত গল্পগুলিতে যে ভারতীয়ত্বের পরিচয় পাবেন  তা আস্বাদ করতে করতে উপরোক্ত পরিপ্রশ্নগুলি নিশ্চয়ই ভুলে যাবে না।
 


^ ভারতকথা, ইস্ক্রা প্রকাশনী, সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষে এই অংশটুকু আমার লেখা।      

Randy Hobler: Language Nations.